একটা দৃশ্য কল্পনা করা যাক, যেখানে রেললাইনের ওপর বসেছে বাজার। এর ওপর অসচেতন ও আনমনে হাঁটছে অসংখ্য মানুষ। সিগনাল পড়লেই যেন ক্রসিং পার হওয়ার তাড়া, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ যেন রোমাঞ্চকর এক অনুভূতির নাম। বাস্তবেও এমন দৃশ্য বাংলাদেশের আনাচে কানাচে সরাসরি দেখা যায়। তবে, রেলওয়ে আইন অনুযায়ী এগুলোর সবই অপরাধ। অসচেতনতায় অহরহ মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের যেমন দায় আছে, তেমনি পুরোনো আইনের দুর্বল প্রয়োগও যেন প্রশ্ন ওঠে— শক্ত অবস্থান না নিয়ে হয়ে কতটা আলতো বিশৃঙ্খল পরিসরে চলে রেল বিভাগ?
মূলত, রেলের লাইনের দুই পাশের নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশও নিষিদ্ধ। তবে সবসময় সেই নিয়ম কিংবা আইনের যথার্থ প্রতিফলন দেখা যায় না। এমনকি সাধারণ অনেক মানুষ জানেও না নির্দিষ্ট একটি পরিসরে হাঁটাচলা করা যাবে না। এটি জানানো সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বলেও মনে করেন অনেকে।রেলওয়ে পুলিশের ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী এই ৫ বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ গেছে ৫ হাজার ৯৮ জনের। শুধুমাত্র ট্রেন লাইনের ওপর বসা বা চলাচলের কারণে মারা গেছে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ।
এদিকে, রেললাইনে সময় কাটাতে পছন্দ করেন অনেকে। লাইনে বসেই কানে ইয়ারফোন দিয়ে উদাস মনে শোনেন গান। গত ৫ বছরে কানে ইয়ারফোন নিয়েই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন ১৬৬ জন।বর্তমান যে আইন, যেটা ১৮৯০ সালের। তাতে রেল সীমানায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ বা অবস্থান করলে ২০ থেকে ৫০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। নতুন একটি আইনের খসড়াও করা আছে, যেখানে জরিমানা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
রেলগেটের লেভেল ক্রসিং যেন আরেক ‘হেলাফেলা’ করার মঞ্চ। সেখানে গেট নামলেও ঝুঁকি নিতে পিছপা হয়না অনেকে। ট্রেন আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত চলে প্রাণপণ দৌড় প্রতিযোগিতা। গত ৫ বছরে রেল ক্রসিং এভাবে দ্রুত পারাপারের চেষ্টা করে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৬৮১ জন।
ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ আইনে অপরাধ হলেও বাস্তবে তা যেন দুঃসাহসিকতার এক প্রতীক। গত ৫ বছরে ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছে ৬৯ জন। ছাদে দাঁড়িয়ে ভ্রমণের সাজা নতুন আইনের খসড়ায় ৫০০ টাকা জরিমানা বা ১ মাসের কারাদণ্ড।এদিকে পুরো দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার চিত্রও বেহাল। কোথাও মহাসড়কের সাথে যুক্ত রেললাইন, কিন্তু নেই রেল ক্রসিং। কোথাও আবার রেল ক্রসিং থাকলেও নেই গেটম্যান। রেল পুলিশের হিসেবে সারাদেশে ১হাজার ৯শ ৩৪ টি রেল ক্রসিং এর মধ্যে ৭শ ২৫ টি অবৈধ।
নতুন আইনের খসড়ায় অনুমতি ছাড়া রেলগেট বা পারাপারের পথ তৈরি করলে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড আর ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান। তবে বিদ্যমান আইনেরই কোন ব্যবহার হয়নি কখনো, তৈরি করা যায়নি কোন নজির। রেল পুলিশ বলছে পর্যাপ্ত লোকবল নেই তাদের।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. তোফায়েল আহমেদ মিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের বহু জায়গায় রেললাইনের উপরে এরকম আছে। আমাদের রেলওয়ে পুলিশের যে জনবল কম। আমরা সব জায়গায় আমরা ট্রেন গার্ডও দিতে পারিনা।’
রেল কর্তৃপক্ষ বলছে রেললাইনে সবসময় ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও তা মানানো যায় না।বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম জানান, ‘রেললাইনের উপর সবসময়ই ১৪৪ ধারা বহাল আছে। এটা আমাদের অনেক জনসাধারণ বা জনগণই জানেন না। আবার যারা জানেন তারাও মানছে না। ইভিকশন করা শেষে দেখা গেছে এর পরবর্তী দিন অথবা ওইদিনই আবার নতুন করে শুরু করে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার বলেন, আইন কার্যকরে দরকার সদিচ্ছা। সেটাই কখনোই হয়নি কারো।
বছরের পর বছর ধরে চলা এই বিশৃঙ্খলা নতুন আইনে কতটা বদলাবে নাকি অবহেলা আর অসচেতনতায় ঝরতেই থাকবে প্রাণ— সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে এখনও। আইন প্রনয়নের পাশাপাশি তার যথার্থ প্রয়োগ তো বটেই, সাধারণ মানুষের সতর্কতাও প্রয়োজন সমানতালে।

















