যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী রূপ দিতে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই সফরকে ভ্যান্সের জন্য একটি ‘বিষাদময় পরীক্ষা’ হিসেবে দেখছেন।
ভ্যান্সের অবস্থান ও দ্বিমুখী সংকট
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধের কট্টর বিরোধী হিসেবে পরিচিত জেডি ভ্যান্স এখন এমন এক যুদ্ধের সমাপ্তি টানার মিশনে নেমেছেন, যে সংঘাত তিনি নিজেই চাননি।
ইসলামাবাদের আলোচনায় তার সামনে এখন দুটি কঠিন পথ খোলা রয়েছে। একদিকে, যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া; অন্যদিকে, আলোচনা ভেঙে দিয়ে আবার যুদ্ধে ফেরার পক্ষে অবস্থান নেওয়া, যা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে মোটেও জনপ্রিয় নয়।
যদি এই শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে যুদ্ধ ফের শুরুর দায়ভার পড়বে ভ্যান্সের কাঁধে, যা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
ইরানের কঠোর শর্ত ও ‘মার্কেট স্টাইল’ কূটনীতি
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আলোচনা শুরুর আগেই নতুন করে দুটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, আলোচনা শুরুর আগে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ হতে হবে এবং বিদেশে জব্দ করা ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করতে হবে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তাদের এই দরকষাকষির পদ্ধতিকে ‘মার্কেট স্টাইল’ বা বিরামহীন দরদাম হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকায় ইরান এখন আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
ট্রাম্পের বার্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
পাকিস্তান সফরের আগে ভ্যান্স গণমাধ্যমকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকে তিনি ‘সুস্পষ্ট নির্দেশনা’ পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যেমনটা বলেছেন, যদি ইরানিরা সদিচ্ছার সঙ্গে আলোচনা করতে চায়, তবে আমরা অবশ্যই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবো। কিন্তু তারা যদি আমাদের সঙ্গে কোনো খেলা খেলতে চায়, তবে তারা দেখবে যে এই প্রতিনিধি দল মোটেও নমনীয় নয়।’
ট্রাম্প সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের ব্যাপারে ভ্যান্সের দর্শন তার চেয়ে ভিন্ন ছিল, তবে পরিস্থিতির প্রয়োজনে এই মিশন তাকে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভ্যান্সের প্রার্থিতার ক্ষেত্রে এই আলোচনার ফলাফল বড় প্রভাব ফেলবে। যুদ্ধ নিয়ে কার্যত নীরব থাকায় ‘মাগা’ সমর্থকদের একটি অংশ এরই মধ্যে তার ওপর অসন্তুষ্ট। এই আলোচনায় তিনি যদি ইরানকে বড় কোনো ছাড় দেন, তবে দলের ভেতরে সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন।
মধ্যস্থতায় অনিশ্চয়তা
লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এবং যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে অস্পষ্টতা ইরানের নেতৃত্বকে ক্ষুব্ধ করেছে। ইরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সঙ্গে ‘টোপ’ হিসেবে যুদ্ধবিরতি ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যুদ্ধের পক্ষে কড়া অবস্থান নিলেও ভ্যান্সকে পাঠানো হয়েছে শান্তির দূত হিসেবে, যা মার্কিন প্রশাসনের মধ্যকার আদর্শিক দ্বন্দ্বকেও সামনে এনেছে।
ট্রাম্পের ‘বলির পাঁঠা’ ভ্যান্স?
ভ্যান্স যদি ইরানের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেন, তাহলে তার সফর সফল বলে মনে হবে। তবে, এর জন্য যুদ্ধপন্থি রিপাবলিকানদের সমর্থন হারাতে পারেন তিনি।
আবার, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করতে ভ্যান্স যদি ইরানকে বড় ছাড় দিতে রাজি হন, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত তেহরানের হাতে থাকে, তবুও সমালোচনার মুখে পড়বে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টকে।
অর্থাৎ, শান্তি আলোচনার ফলাফল যা-ই আসুক, ভ্যান্সকেই তার ভার বহন হবে।


















